কোলকাতা থেকে দার্জেলিং ভ্রমণ। ভারতে তৃতীয়দিন।

দার্জেলিং
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ভারতে তৃতীয়দিন দার্জেলিং

ট্রেনে কোরিয়ান ট্যুরমেট হোয়েক এর সাথে দার্জেলিং ভ্রমণ নিয়ে পরিকল্পনা করতে বসলাম । সে আমাকে জিজ্ঞেস করলো আমার কোথায় কোথায় যাবার প্ল্যান । আমি বললাম নো প্ল্যান ইজ দ্যা বেস্ট প্ল্যান। সে আমাকে বললো দ্যাট ইজ আলসো মাই প্ল্যান।

ভারত ভ্রমণের প্রথমদিন এবং দ্বিতীয় দিন পড়ে আসতে পারেন।

একা একা ভ্রমণ করার এই এক মজা। অনেক রকমের বন্ধু জুটে যায়। যাত্রপথে এই রকম ভিনদেশি ট্যুরমেট পেয়ে আমার ভালোই লাগলো। একদিকে প্রথম ভারত ভ্রমন। আরেকদিকে কোরিয় ট্যুরমেট। অনেক কিছু জানা যাবে। আমি কি করি জিজ্ঞেস করলো। আমি বললাম ব্যাবসা করি। কিসের? কাপড়ের।

হোয়েক কি করে জানতে চাইলাম । সে বললো সেনাবাহীনিতে জব করে। খেয়াল করলাম ওর চুল বেশ বড়। আমি বললাম যে তোমার চুল তো বেশ বড় দেখে তো সেনাবাহিনীতে জব করো বলে মনে হয় না। আমার কথা শুনে হাসি দিলো। বললো সে ছুটিতে আছে। গত ৪৫ দিন ধরে বিভিন্ন দেশে ঘুরছে। ভারতে আসার আগে চীন থেকে ঘুরে এসেছে। দার্জেলিং থেকে নেপাল ভুটান ঘুরে এর পর আফ্রিকা ঘুরতে যাবে। আরোও জানালো এইটাই তার দেশের বাইরে প্রথম বের হওয়া। অনেক দিন ধরে টাকা জমিয়ে একসাথে বের হয়েছে । সারা পৃথিবী ঘুরে দেখবে। আমি তার কথা শুনে রিতিমত টাস্কি খেলাম।

পরে জানলাম যে বাধ্যতামুলকভাবে দক্ষিন কোরিয়ার প্রত্যেক নাগরিককে জিবনের একটা সময় সেবাবাহিনিতে থাকতে হয়।

দার্জেলিং থেকে আমি কোলকাতা ফিরে আসবো। হোয়েক এর প্ল্যান সে যাবে গ্যাংটক। সিকিমের রাজধানি হচ্ছে গ্যাংটক । আমাকেও যেতে বললো । হোয়েককে বললাম আমার গ্যাংটকে যাবার অনুমতি নাই । সে সময় বাংলাদেশিদের সিকিমে যাবার অনুমতি ছিলো না । পরে ২০১৮ সাল থেকে বাংলাদেশীদের সিকিমে যাবার অনুমতি দেয়া হয় ।

হোয়েককে বাংলাদেশে আসার জন্য বলি । সে ইন্টারনেটে তাদের ভাষায় কি যেনো চেক করলো । হঠাত তার মুখ কালো হয়ে গেলো । আমি তাকে বললাম এনি প্রবলেম? সে বললো যে আমাদের দেশে আসতে তার মানা আছে । জংগী সমস্যা । কয়েকদিন আগে আমাদের দেশে হলি আর্টিজানে হামলা হয়েছিলো । তাই তাদের দেশে নাগরিকদের এ দেশে আশা সাময়িক বারন । কোরিয়ার নাগরিকরা যখন দেশের থেকে বাইর হয় তারা তখন আলাদা একটি এপস ব্যবহার করে । সেখান থেকে তারা অনেক ইনফরমেশন পায় ।

 

ট্রেনে উঠার কিছুক্ষন পর রাতের খাবারের কথা মনে হল। আমি মনে করেছিলাম ট্রেনে ক্যফেটেরিয়া টাইপের কিছু থাকবে । খবর নিয়ে জানলাম এই ট্রেনে খাবারো কোন ব্যবস্থা নাই । তাহলে রাতে উপোস থাকতে হবে?? আসে পাশের কয়েকজন যাত্রি জানালেন যে ট্রেন কয়েকটা ‍স্টেশনে দাড়াবে । সেখানে কিছু খেয়ে নেয়া যাবে ।

মেইল ট্রেনের বগিতে যাচ্ছি । বাকি যাত্রিরা সবাই ভারতিয় । হোয়েক যেহেতু বিদেশি, অনেকে এসে তার সাথে কথা জমাতে শুরু করলো। আমি মোটামুটি হোয়েক এর দোভাষী হিসেবে কাজ করা শুরু করলাম।

হোয়েককে বললাম দোভাষী হিসেবে কাজ করছি তোমার অনেক পেমেন্ট চার্জ হবে কিন্তু। মজা বুঝে সে  হো হো করে হেসে উঠলো।

রাত ১২ টা কি ১ টায় ট্রেন একটা স্টেশনে এসে দাঁড়ালো। নেমে পুরি আর ডাল দিয়ে খেলাম । ভারতের একটা জিনিস ভালো লেগেছে স্ট্রিট ফুডের বাটিগুলো পাতা দিয়ে তৈরি । ওয়ান টাইম ইউজ। ডালটা ঝাল লবন কম ছিলো । খেতে বিস্বাদ লাগলেও তিনটা পুরি খেলাম। এটাই আজ রাতের ডিনার।

খওয়া শেষ করতেই ট্রেন ছেড়ে দিলো। হোয়েক ট্রেন থেকে নামলো না । সে খেয়ে উঠেছে। নাকি ব্যাগ চুরি হবার ভয়ে নামে নাই তাই আমি ভাবছিলাম।

নন এসি স্লিপার কোচ। তার মানে হচ্ছে দোতলা বেড এর ট্রেন। খুব ভালোভাবে ঘুমানো যাবে। হোয়েক এর সিট আমার উপরে । তাকে জিজ্ঞেস করলাম উপরে অথবা নিচে যেকোন বেডে সে ইচ্ছে মতো ঘুমুতে পারবে। সে বললো উপরে ঘুমাবে।

দুই তিন সিট পরে কিছু পোলাপাইন দল বেধে উঠেছে। তারা দল বেধে গান গাওয়া শুরু করলো। ভালই লাগছিলো। অনেকের ঘুম ঘুম চোখ । গান গাওয়া নিয়ে সমস্যা হচ্ছিলো। এরই মধ্যে একটা ছেলে বললো আমরা আর দশ মিনিট গান গেয়ে ঘুমিয়ে যাবো। কেউ আর মানা করে নাই। ওদের গান গাওয়া শেষে সবাই মনে হয় ঘুমিয়ে গেছে ট্রেনে । কোন মানুষের আর শব্দ নেই। শুধু ট্রেনের শব্দ । আমিও ঘুমিয়ে পড়লাম।

ট্রেনে সকাল হলো। আমাদের সামনের সিটে ছোট্ট বন্ধু ভুমি দাস বসে আছে। ভুমির বয়স ৯ বছর। ভুমি তার বাবা মায়ের সাথে গ্যাংটক যাচ্ছে। তারা মধ্যপ্রদেশ থেকে এসেছে। আমি প্রথমে তাদের কলকাতার মনে করেছিলাম। গতকাল রাতে তাদের সাথে বাংলায় কথা বলছিলাম দেখে আড্ডা তেমন জমে উঠে নাই।

ট্রেন থেকে নামার সময় একটু কনফিউশনে পড়ে গেলাম । একদম কাছাকাছি দুইটি ট্রেন স্টেশন। একটি NJP অর্থাৎ নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন। এর একটু পরেই শিলিগুড়ি রেল স্টেশন। নেটে ঘাটাঘাটি করলাম। কেউ অনলাইনে সাজেস্ট করেছিলেন যে, নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে নেমে দার্জেলিং যাওয়া যায়। আবার কেউ বলছিলেন যে শিলিগুড়ি থেকে নামা যায়। আমি নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে নেমে গেলাম। স্টেশনে চিকেন পেটিস খেলাম। ৭০ রুপী । হোয়েককে দেখলাম খুটিয়ে খুটিয়ে অনেক কিছু দেখছে । নাস্তা কি দিয়ে করবে তা বুঝে উঠতে পারছেনা। সে কিছু খুজছে কিনা জিজ্ঞেস করলাম। হেসে বললো কম খরচে কিছু নাস্তা করা যায় কিনা তা দেখছে। এই এক কথায় আমি হাঁফ ছেড়ে বাচলাম। কম খরচে আমিও ট্যুর দিতে চাই।

স্টেশন এর বাইরে জিপ স্টেশন। শেয়ার্ড জিপে করে দার্জেলিং যাওয়া যায়। জিপ ভাড়া ১৭০ রুপী চাইলো। হোয়েক নেট ঘেটে জানালো ১৩০ রুপী ভাড়া। আমিও অনলাইনে বিভিন্ন ব্লগ পড়ে দেখলাম ১২০-১৩০ রুপী ভাড়া। এখানে আসলে তেমন ট্যুরিস্ট নাই তাই ভাড়া বেশি চাচ্ছে। শিলিগুড়ি স্টেশন থেকে কম ভাড়ায় যাওয়া যায়। ১৭০ রুপী ভাড়া দিয়ে জিপে উঠে পরলাম।

এই লেখাটি পড়ে যারা দার্জেলিং যাবেন, তারা খেয়াল রাখবেন যে, নিউ জলপাইগুড়ি না নেমে শিলিগুড়ি স্টেশনে নামবেন। সেখান থেকে সহজেই দার্জেলিং এর গাড়ি পাবেন। আসার পথে আমি শিলিগুড়ি এসেছিলাম তখন কম খরচে আসতে পেরেছি।

গাড়ি নামিয়ে চলা শুরু করলো। শিলিগুড়িতে অনেক গরম। ম্যাপে দেখলাম আমি বাংলাদেশের একদম বর্ডার এর খুব কাছেই। শিলিগুড়ির রাস্তার মাঝখানে গরু দাঁড়িয়ে আছে। আর এর মাঝে সাঁই সাঁই করে গাড়ি ছুটে যাচ্ছে। কিছুক্ষন চলার পরেই পাহাড় চোখে পড়লো। এবার অবাক হবার পালা হটাত আবহাওয়া ঠাণ্ডা। দার্জেলিং যাওয়ার এই পথটা গাড়িতে বসে উপভোগ করার মতো। দুরের পাহাড়ের গাড়িগুলোকে ছোট ছোট খেলনা গাড়ির মতো মনে হবে। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে বিভিন্ন গ্রাম দেখার মতো। পাহাড়ি রাস্তা হলেও অনেক ভালো। আমাদের পার্বত্য অঞ্চলে যে পাহাড়ি রাস্তা আছে সেগুলু দেখা যায় যে অনেক সময় খাড়া উঠে গেছে। কিন্তু ওদের ওখানের রাস্তাগুলো ঘুরে ঘুরে পাহাড়ে উঠেছে। দেখতে ভালোই লাগে।

প্রায় সাড়ে তিনঘন্টা পর মল রোডে আমাদের গাড়ি নামিয়ে দিলো। এবার হোটেল খুজার পালা। যেহেতু আমি আর হোয়েক দুইজনেই কম খরচে ট্যুর দিতে চাচ্ছিলাম তাই আমরা সবচেয়ে কমে যে হোটেল পাওয়া যায় তা খুজছিলাম। এপ্রিল মে জুন এই তিন মাসে দার্জেলিং এ অনেক ট্যুরিস্ট থাকে। কারন কলকাতায় তখন গরম পড়ে। সাবাই রিলাক্স এর জন্য দার্জেলিং যায়। কম খরচে রুম পাচ্ছিলাম না। দার্জেলিং এর মল রোডের রাস্তা গুলো অনেক উচু নিচু। হাটা অনেক কষ্ট। তারমধ্যে ব্যাকপ্যাক নিয়ে কয়েকটা হোটেল এ ঘুরে কাহিল হয়ে পড়লাম।

আমি কিছুক্ষন রেস্ট নিতে চাইলাম। হোয়েক বললো তুমি এখানে কিছুক্ষন ওয়েট করো। আমি কয়েকটা হোটেল খুজে আসি। ওর এক পরিচিত ফ্রেন্ড অনলাইনে কিছু হোটেল সাজেস্ট করেছে সেগুলো দেখে আসবে। পরে মলরোড থেকে পাহাড়ের উপরে একটা হোটেল পেলাম ৫০০ রুপী পার ডে ডাবল বেড। আমি আর হোয়েক শেয়ার করে হোটেলে উঠে পরলাম।

হোটেল ম্যানেজার অনেক মিশুক। মোটুমুটি এলাকা সম্পর্কে একটা ধারনা দিলো। বাথরুমে গিজার নাই। সে বললো গরম পানি যখন লাগবে সে পাঠিয়ে দিবে। যাস্ট বললেই হবে। আমি বললাম এখনই লাগবে গোসল করে এলাকাটা দেখতে বের হবো। সে হেসে বললো ওকে পাঠিয়ে দিচ্ছে।

গোসল করে বের হলাম দুপুরের খাবার খেতে। এর মধ্যে হোয়েক বললো সে মমো খাবে। দার্জেলিং এর বিখ্যাত খাবার নাকি মমো। মমো দিয়েই লাঞ্চ করবে। আমিও সায় দিলাম । মমো খুজার অভিজান শুরু হলো। কিন্তু স্ট্রিট ফুড পাওয়া যায় সাধারণত রাতে। দুপুরে অখানে তেমন স্ট্রিট ফুড নিয়ে বসতে দেখলাম না। একটা ছাপড়া মতো দোকান চোখে পড়লো মল রোডের পাশেই। সেখানে মমো আছে কিনা জিজ্ঞাস করলাম। তারা বললো কিছুক্ষন অপেক্ষা করতে হবে। অর্ডার দিলে বানিয়ে দিবে। মমো অর্ডার করলাম। মল রোডের অলিগলি হাটতে লাগলাম।

এর মধ্যে হোয়েক গান ধরলো মমো মমো ম ম ম ও ও ও ও ও  মমো ও ও ও ও ও  ও ইয়াম্মি মমো ও ও ও ও ।

ঘুরাঘুরি শেষে মমো খেলাম। দার্জেলিং এ যে কয়েকদিন ছিলাম অনেক মমো খেয়েছি। যেমন এগ মমো, ভেজ মমো, চিকেন মমো, ফ্রাইড মমো। অনেকে আবার কয়েকরকম সস দিয়েও দেয়। খারাপ লাগে নাই।

আগামিকাল সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতে হবে কারন কাল কাঞ্চনঝংগা দেখতে যাবো। সকাল ৪ টায় গাড়ি ছেড়ে যায়। টাইগার হিলস এর উদ্দ্যেশে। টাইগার হিলস এ যাবার গাড়ি কোথা থেকে ছাড়ে তা জেনে নিলাম।

বিকেলে হোটেলে আসলাম কিছুক্ষন রেস্ট নেয়ার জন্য জার্নির ধকল গেলো সেটা সামলানোর চেস্টা করলাম। হোটেলে ফিরার পর ম্যানেজার জানালো এই হোটেলে আরও একজন দক্ষিন কোরিয় ট্যুরিস্ট এসেছে। হোয়েক তার সাথে দেখা করতে গেলো। ওর নাম জ্যাক। আমাদের বয়সীই । ব্যাকপাকার। আড্ডা দিলাম রুমে তিনজনই।

রাতে খওয়া দাওয়া করতে বের হলাম। গতদুই দিন ধরে ভাত খাওয়া হচ্ছিলো না। আমরা বাংগালিরা আবার বেশিদিন ভাত না খেলে কেমন কেমন যেনো লাগে। কোরিয় দুই বন্ধুকেও রাজি হলো ভাত খেতে। ওরা কখনো নাকি হাত দিয়ে ভাত খায় নাই। তারা কিছুক্ষন প্রাক্টিস করলো হাত দিয়ে ভাত খাওয়া। খাওয়া শেষে মল রোডে ঘুরাঘুরি শেষে হোটেলে ফিরে এসে আড্ডায় বসলাম। আগামিকাল সকালে কাঞ্চনঝংগা যাবো।

আমার ইউটিউব চ্যানেল চাইলে ঘুরে আসতে পারেন। 


Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

One Reply to “কোলকাতা থেকে দার্জেলিং ভ্রমণ। ভারতে তৃতীয়দিন।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *