জাহাজের পুরাতন কন্টেইনার দিয়ে বাড়ি বানানো।

জাহাজের পুরাতন কন্টেইনার
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

জাহাজের কনটেইনার দিয়ে যে বাড়ি বানানো যায় সেটা আমার জানা ছিলনা। আমার শ্রদ্ধেয় বড় ভাই ডাক্তার ইমরুল একদিন আমাকে এব্যাপারে জানালেন। আমি যেহেতু চট্টগ্রামে থাকি, এখানে পুরাতন কন্টেইনার পাওয়া যেতে পারে। ইমরুল ভাই সে ব্যাপারে খোঁজখবর নিতে বললেন।

ইম্রুল ভাই ডাক্তারি কোর্স করার জন্য দেশের বাইরে বেশ কিছুদিন ছিলেন। তিনি একজন প্রকৃতিপ্রেমী। মূলত ডাক্তার হলেও তিনি সময় পেলেই ঘর থেকে বের হয়ে যান। প্রকৃতির সাথে মিশে থাকাই যেন তার নেশা।

আমারও নতুন কিছু পেলে সেটা নিয়ে ঘাটাঘাটি করার শখ। ছোটবেলা থেকেই সুযোগ পেলে ভাটিয়ারিতে চলে যেতাম। আমরা যারা চট্টগ্রামে থাকি তারা আসলেই প্রকৃতির আশীর্বাদে পরিপূর্ণ।

চট্টগ্রামের ভাটিয়ারীর এলাকা অনেকের কাছেই পরিচিত। এই ভাটিয়ারী এলাকাতে সরকারি মিলিটারি একাডেমি আছে। তারা এই পাহাড়ী এলাকা টাকে খুব সুন্দর করে রেখেছেন। স্বাভাবিকভাবেই সেনাবাহিনীর এলাকা গুলো অনেক সাজানো-গোছানো হয়। প্রকৃতির খুব কাছে আসার জন্য অনেকেই ভাটিয়ারিতে আসেন।

তবে আমার কাছে ভাটিয়ারী অন্য কারনে ভালো লাগে। কারণ এখানে জাহাজের অনেক মালামাল পাওয়া যায়। বাংলাদেশের লোহার চাহিদা পূরণ হয় ভাটিয়ারী শিল্প এলাকা থেকে। বিশাল বিশাল জাহাজ এখানে কাটা হয়। সাধারণত একটি নতুন জাহাজ 20 থেকে 25 বছর পানিতে ভাসে। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী পুরাতন জাহাজগুলোকে আর চলতে দেয়া হয় না।

বাংলাদেশের অনেক শিল্পগোষ্ঠী এ পুরাতন জাহাজগুলো  কিনে নিয়ে আসেন। এই জাহাজগুলোকে কেটে গলিয়ে আবার লোহার বিভিন্ন জিনিস বানানো হয়।

আন্তর্জাতিক জাহাজগুলো সুবিশাল হয়। একটা জাহাজ যেন একটি পরিপূর্ণ শহর। মোটকথা একটি শহরের বাসিন্দাদের যা যা প্রয়োজন হয়, তা একটি জাহাজে থাকে।

জাহাজের বিভিন্ন মালামাল অনেক শক্তপোক্ত এবং টেকসই হয়। পুরাতন জাহাজগুলোর মালামাল ভাটিয়ারী এলাকায় পাওয়া যায়। একইভাবে মালবাহী জাহাজের কনটিনার ও পাওয়া যায়।

এবার আসি ইমরুল ভাইয়ের কেন কন্টেইনার দিয়ে বাড়ি বানানোর শখ হল। ইমরুল ভাইয়ের একটি শখ হচ্ছে নৌকা চালানো। তিনি নিজেই কায়াক বানিয়ে থাকেন। কায়াক হচ্ছে ছোট্ট এক ধরনের নৌকা। ইম্রুল ভাই থাকেন ঢাকা শহরে। উনার কায়াকগুলো রাখার জন্য একটি জায়গা দরকার। কায়াক গুলো শহর থেকে নদীতে নিয়ে চালানো অনেক কষ্টকর। কায়াক গুলোকে নদীর পাশে একটি ঘরে রাখলে সুবিধা হয়। সেই পরিকল্পনা থেকে তিনি ঠিক করেছেন কন্টেইনার দিয়ে একটি গুদাম ঘরের মতো করবেন। সেখানে কায়াক রাখবেন। যদি পারা যায় ছোট্ট একটি ঘর বানাবেন।

আমি চট্টগ্রামের সিটি গেইট এলাকায় থাকি। এলাকার নাম ফিরোজ শাহ। ইমরুল হয় প্রায়ই ঢাকা হতে চট্টগ্রাম রোগী দেখতে আসেন। আমার বাইকে করে উনাকে নিয়ে একদিন রওনা দিলাম ভাটিয়ারী এলাকায়। উদ্দেশ্য পুরাতন কন্টেইনার কোথায় পাওয়া যায় তা দেখা।

এর আগে আমার নিজেরও আইডিয়া ছিলো না পুরাতন কন্টেইনার কোথায় পাওয়া যায়। ঢাকা-চট্টগ্রাম রোডে গাড়ি দিয়ে যাওয়া আসার সময় অনেক সময় কন্টেইনার চোখে পড়তো। সেগুলো আসলে কি কাজে ব্যবহার হতো তা এর আগে আমার জানা ছিল না। যাহোক ইমরান ভাইকে নিয়ে একদিন রওনা দিলাম ভাটিয়ারীর উদ্দেশ্যে।

জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় কয়টি কন্টেইনার চোখে পড়লো। বাইক থামালাম। দেখলাম পুরাতন কন্টেইনার গুলোকে বিভিন্ন মডিফাই করা হচ্ছে। পুরাতন কন্টেইনার গুলোকে দিয়ে আমাদের দেশে সাধারণত কাভার্ডভ্যান তৈরি করা হয়।

তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম এগুলো দিয়ে কি বাড়ি বানানো যায় কিনা। এর জবাবে তারা একটি কন্টেইনার কে তারা নিজেদের অফিস বানিয়েছে সেটা দেখালো। আমি জিজ্ঞেস করলাম বাংলাদেশি কেউ কি কন্টেইনার দিয়ে বাড়ি বানিয়েছে কিনা। হ্যাঁ বলল । এপর্যন্ত তিন-চারটি বাড়ি বানানো হয়েছে কন্টেইনার দিয়ে।

বাংলাদেশে অনেক গরমের দেশ। যেহেতু কন্টেইনার গুলো সম্পূর্ণ লোহার তৈরি ভিতরে গরম লাগবে কিনা সেটা জিজ্ঞেস করলাম। আসলে কন্টেইনার গুলোর ভিতরে ইন্টেরিয়র করতে হয়। ভিতরে ফলস সিলিং দিতে হয়। পাশাপাশি বড় গাছের ছায়া নিচে রাখলে ভালো হয়।

তাদেরকে দেখলাম কনটেইনারের উপরে বিভিন্ন লতানো গাছ চালকুমড়া গাছের মতো অনেকগুলো গাছের লতা উঠিয়ে দিয়েছে। এতে একসাথে দুটি কাজ হয়েছে। শাকসবজি ও পাওয়া গেল, কন্টেনারগুলি ঠান্ডা থাকলো।

কনটিনার গুলো সাধারণত দুই ধরনের সাইজ হয়। কিছু কনটেইনারের সাইজ লম্বায় 20 ফিট। কিছু কন্টেইনার লম্বায় 40 ফিট।

এবার আসি কন্টেইনার গুলো এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়ার সমস্যার সমাধানের ব্যাপারে।

লোহার কন্টেইনার ওজনে অনেক ভারী হবে এটাই স্বাভাবিক। ইমরুল ভাই কন্টেইনার গুলো ঢাকার ধলেশ্বরী নদীর পাশে নিতে চাচ্ছিলেন। কনটিনার যেখানে নেয়া হবে সেখানে অবশ্যই ভাল রাস্তা থাকতে হবে। কন্টেইনার গুলো নামানোর জন্য অবশ্যই ক্রেন লাগবে।

আমাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা নেয়ার জন্য কনটেইনারের খরচ কত হতে পারে। 20 থেকে 25 হাজার টাকা গাড়ি ভাড়া লাগবে। এছাড়াও ক্রেন দিয়ে নামানোর জন্য প্রয়োজনীয় খরচ লাগতে পারে।

আমাদের দেশে কন্টেইনার দিয়ে অনেক দামি বাড়ি বানানো আছে। বাসায় ফিরে নেটে সার্চ দিলাম। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একটি কনটেইনারের বাড়ি আছে। যে কেউ ওই বাড়িতে চাইলে ভাড়া থাকতে পারে। সম্ভবত প্রতিদিনের ভাড়া 15000 টাকা। সে এক বিশাল এলাহি কারবার। বাড়ির মালিক তানজিম এশ। স্টাসির মালিক।

আমি যখন কন্টেইনার দেখতে গিয়েছিলাম তখন মালিক ছিল না। নাম্বার রাখা হয় নি। ছোট ভিডিও করেছিলাম। সিটি ইউটিউবে দেই। ইউটিউবে আপলোড এর পরে খুব কম সময়ে দুই লাখের অধিক মানুষ সেটি ভিউ করেছিল।

আসলে ভিডিও করার কোনো প্রস্তুতি নিয়েই যায়নি মোবাইল দিয়েই ভিডিওটি করা ছিল। ভিডিওর কমেন্টে অনেকে জানতে চেয়েছেন মালিকের নাম্বার। আসলে মালিকের নাম্বার নিতে একদমই ভুলে গিয়েছিলাম।

যারা কনটিনার নিতে চাচ্ছেন তাদের জন্য আমার কিছু টিপস আছে।

সরাসরি এসে দেখতে হবে। এক্ষেত্রে ফোনে কথা বলার মত তেমন কিছুই নেই। আমার জানামতে চট্টগ্রামে আরও কয়েকটি জায়গায় কন্টেইনার দিয়ে এরকম কাস্টমাইজড বাড়ি বানানো যায়। এরকম আরো মালিকের মোবাইল নাম্বার পেলে আমি এই ওয়েবসাইট দিয়ে দিব।

ওদের সাথে কথা বললে ওরা প্রয়োজনীয় দরজা-জানালা বানিয়ে দিবে। ইন্টেরিয়র করে দিতে পারবে বলেছে। আসলে সরাসরি এসে দেখার কোনো বিকল্প নেই। কেউ যদি বাড়ি বানাতে চান দরজা-জানালা ভাটিয়ারী এলাকা থেকে নিতে পারেন। ভাটিয়ারী এলাকায় পুরাতন জাহাজের দরজা-জানালা পাওয়া যায়। সেগুলো অনেক টেকসই।

এখানে আমি গুগল ম্যাপসের লিঙ্ক দিয়ে দিলাম। ম্যাপ দেখে আশাকরি সহজেই চলে যেতে পারবেন।
জাফরাবাদ উপ ডাকঘরের ঠিক পাশেই । https://goo.gl/maps/W3A47VhBPzKEkkBa9
পাবলিক ট্রান্সপোর্টে আসলে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় নামবেন।

পাবলিক ট্রান্সপোর্টে কিভাবে যাবেন।

চট্টগ্রাম থেকে ভারী এবং সীতাকুণ্ড এলাকার লোকাল বাস পাবেন। চট্টগ্রামের যে কোন এলাকা থেকে প্রথমে একেখান মোড় চলে আসবেন। একেখান মোড় থেকে ভাটিয়ারী এবং সীতাকুণ্ডের লোকাল বাস ছেড়ে যায়। জঙ্গল সলিমপুর নেমে গেলেই কন্টেইনার ডিপো পাবেন।
লোকাল বাসে বাস ভাড়া এখান থেকে 10 টাকা নিবে।

চট্টগ্রাম শহর থেকে সিএনজি তে আসতে পারবেন না। যেহেতু এলাকাটা ঢাকা চট্টগ্রাম হাইওয়ে তাই সিএনজি চলেনা। বার কিংবা পাঠাও রাইড শেয়ারিং এর মাধ্যমেও আসতে পারবেন।

আমার অন্যান্য ভ্রমণ লেখা এখানে পড়তে পারেন। 

Facebook page

Facebook profile 

 

 


 


Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

One Reply to “জাহাজের পুরাতন কন্টেইনার দিয়ে বাড়ি বানানো।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *